অনেক সময় ভালো গতির ব্রডব্যান্ড প্যাকেজ থাকা সত্ত্বেও ফোনে বা ল্যাপটপে ব্রাউজ করতে গেলে বাফারিং পোহাতে হয়। স্পিড টেস্টে পুরো স্পিড দেখালেও বাস্তবে কোনো পেজ লোড হতে সময় নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যাটি কিন্তু ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP)-এর দিক থেকে থাকে না; আসল ঝামেলাটা হয় আপনার বাসার ওয়াইফাই সিগন্যাল এবং রাউটারের সেটআপে।
অহেতুক প্যাকেজ আপগ্রেড করার আগে নিচের ১০টি সহজ সেটিংস ও ট্রিকস কাজে লাগিয়ে দেখুন:
১. রাউটারের অবস্থান ঠিক করা (সেন্ট্রাল প্লেসমেন্ট)
রাউটারকে ঘরের কোণায়, আলমারির আড়ালে বা মেঝের কাছাকাছি রেখে দিলে ওয়াইফাই সিগন্যাল চারদিকে সমানভাবে ছড়াতে পারে না। কনক্রিটের দেয়াল এবং ধাতব আসবাবপত্র রেডিও ওয়েভ আটকে দেয়। রাউটার সবসময় ঘরের কেন্দ্রীয় জায়গায় এবং কিছুটা উঁচুতে (অন্তত ৪-৫ ফুট উপরে) রাখুন, যাতে সিগন্যাল কোনো বাধা ছাড়াই ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. ২.৪ গিগাহার্টজ ছেড়ে ৫ গিগাহার্টজে সুইচ করা
আপনার রাউটার যদি ডুয়াল-ব্যান্ড (Dual-Band) হয়, তবে আপনি দুটি নেটওয়ার্ক দেখতে পাবেন: 2.4 GHz এবং 5 GHz।
-
২.৪ গিগাহার্টজ বেশি দূর পর্যন্ত যায় ঠিকই, তবে এতে গতি কম থাকে এবং আশেপাশের ডিভাইসের সিগন্যালে ইন্টারফিয়ারেন্স তৈরি হয়।
-
রাউটারের কাছাকাছি থাকলে সবসময় ৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার করুন। এতে বাফারিং ছাড়া সর্বোচ্চ ব্যান্ডউইথ পাওয়া যায়।
৩. ওয়াইফাই চ্যানেল কনজেশন পরিবর্তন করা
আশেপাশের ফ্ল্যাট বা প্রতিবেশীদের রাউটার যদি একই ওয়াইফাই চ্যানেলে কাজ করে, তবে চ্যানেল জ্যাম তৈরি হয়।
-
অ্যান্ড্রয়েডের WiFi Analyzer অ্যাপ ব্যবহার করে দেখে নিন কোন চ্যানেলটি ফাঁকা রয়েছে।
-
রাউটারের অ্যাডমিন প্যানেলে লগইন করে ২.৪ গিগাহার্টজের জন্য Channel 1, 6 অথবা 11-এর মধ্যে কম ট্রাফিকের চ্যানেলটি সিলেক্ট করে দিন। ৫ গিগাহার্টজের ক্ষেত্রে চ্যানেল উইডথ (Channel Width) ৮০ মেগাহার্টজ (80MHz) সেট করুন।
৪. ফাস্ট ও পাবলিক ডিএনএস (DNS) ব্যবহার করা
অনেক সময় লোকাল আইএসপির ডিএনএস সার্ভার স্লো থাকায় সাইট লোড হতে অতিরিক্ত সময় নেয়। রাউটার সেটিংসে গিয়ে ডিএনএস পরিবর্তন করে গ্লোবাল ও ফাস্ট পাবলিক ডিএনএস সেট করে নিন:
-
Cloudflare DNS: Primary:
1.1.1.1| Secondary:1.0.0.1 -
Google DNS: Primary:
8.8.8.8| Secondary:8.8.4.4
৫. শিডিউল রিবুট বা নিয়মিত রিস্টার্ট দেওয়া
রাউটারও এক ধরনের ছোট কম্পিউটার—এটিতে নিজস্ব প্রসেসর এবং র্যাম থাকে। একটানা কয়েক সপ্তাহ চলার পর এর ক্যাশ মেমোরি ফুল হয়ে রাউটার গরম ও স্লো হয়ে যায়। সপ্তাহে অন্তত একবার রাউটার কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ করে আবার চালু করুন। আধুনিক রাউটারে Auto-Reboot Schedule থাকে, যা চালু রাখলে প্রতি রাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিস্টার্ট হয়ে পারফরম্যান্স রিফ্রেশ থাকে।
৬. অপ্রয়োজনীয় ডিভাইস ও ব্যাকগ্রাউন্ড সিঙ্ক বন্ধ করা
অনেক সময় ঘরে আসা মেহমানদের ফোন বা স্মার্ট টিভির মতো ডিভাইসগুলোতে ব্যাকগ্রাউন্ডে অটো-আপডেট বা ক্লাউড ব্যাকআপ চলতে থাকে। রাউটারের ক্লায়েন্ট লিস্ট (Client List) চেক করে দেখুন কোনো অচেনা ডিভাইস ব্যান্ডউইথ খাচ্ছে কিনা। অপ্রয়োজনীয় ডিভাইস ডিসকানেক্ট করুন এবং টরেন্ট বা ক্লাউড সিঙ্ক অ্যাপ সাময়িকভাবে পজ করে রাখুন।
৭. কোয়ালিটি অফ সার্ভিস (QoS) কনফিগার করা
বাসার একজন যখন ৪K রেজোলিউশনে ইউটিউব দেখছে বা বড় ফাইল ডাউনলোড করছে, তখন অন্য ডিভাইসে কাজের গতি কমে যাওয়া স্বাভাবিক। রাউটারের QoS (Quality of Service) ফিচার চালু করে আপনার কাজের ল্যাপটপ বা গেমিং পিসিকে অগ্রাধিকার (Priority) দিয়ে রাখুন। এতে অন্য ডিভাইসে ভারী কাজ চললেও আপনার কাজের ডিভাইসে মসৃণ গতি বজায় থাকবে।
৮. রাউটারের অ্যান্টেনা পজিশন ঠিক করা
রাউটারের বাইরে থাকা অ্যান্টেনাগুলো সিগন্যালকে নির্দিষ্ট দিকে ধাক্কা দেয়। দুটি অ্যান্টেনা থাকলে একটি সোজা ওপরের দিকে (Vertical) এবং অন্যটি আড়াআড়ি (Horizontal) করে দিন। এতে আপনার বিভিন্ন কোণে রাখা ফোন বা ডিভাইসে রেডিও তরঙ্গের রিসেপশন সবচেয়ে ভালো মিলবে।
৯. ভারী কাজের জন্য ল্যান ক্যাবল (Ethernet) ব্যবহার করা
গেমিং, বড় ফাইল ট্রান্সফার বা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের সময় কোনো ওয়াইফাই সিগন্যালই ক্যাবলের মতো স্থিতিশীল ও ল্যাটেন্সি-ফ্রি পারফরম্যান্স দিতে পারে না। সুযোগ থাকলে পিসি বা ল্যাপটপে সরাসরি একটি Cat6 Ethernet Cable দিয়ে সংযোগ দিন। এতে কোনো প্যাকেট লস ছাড়া ১০০% রিয়েল স্পিড মিলবে।
১০. সিকিউরিটি প্রোটোকল আপডেট ও পাসওয়ার্ড পরিবর্তন
দুর্বল পাসওয়ার্ড দিলে প্রতিবেশীরা অনায়াসে আপনার ওয়াইফাই ব্যবহার করতে পারে। রাউটারের ওয়্যারলেস সিকিউরিটিতে WPA2-PSK (AES) অথবা নতুন রাউটারে WPA3 সেট করুন। কোনো অবস্থাতেই পুরনো WEP বা WPA ব্যবহার করবেন না। প্রতি ৩–৪ মাস পর পর পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করলে অযাচিত কানেকশন এড়ানো যায়।
ইন্টারনেট স্পিড বাড়ানো মানেই প্রতিবার বড় অংকের টাকা খরচ করে প্যাকেজ বড় করা নয়। শুধু রাউটারের প্লেসমেন্ট এবং সঠিক ব্যান্ড ও চ্যানেল বেছে নিলেই ঘরে থাকা ইন্টারনেটের পুরো শক্তি কাজে লাগানো সম্ভব।





0 Comments
Be the first to comment.
Leave a comment